আত্মবিশ্বাস শব্দটি সাধারণত ব্যবহার করা হয় একজন মানুষের জীবনে নিজস্ব মতামত, সামর্থ্য এবং শক্তি সম্পর্কে নিজের সুচিন্তিত আস্থা বোঝাতে। মানুষের জীবনে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় তার অভিজ্ঞতা,কাজে সফলতা-ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন ধরণের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ফলে। এটি একটি ইতিবাচক বিশ্বাস যা মানুষকে তার জীবনের ইচ্ছে-অনিচ্ছে এবং সঠিক ক্যারিয়ার নির্বাচনে সহায়তা করে।ক্যারিয়ার নির্বাচন করা পর্যন্তই যে শুধু আত্মবিশ্বাস এর প্রয়োজন তা কিন্তু নয়।কর্মজীবন সঠিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সাথে সাফল্য অর্জন করা, দুই এর জন্যই আত্মবিশ্বাস এর প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জরুরী।
আজকের লেখনিতে চেষ্টা করব কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হলে তা সামলে ওঠা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার কিছু উপায় তুলে ধরতে। প্রথমেই কর্মক্ষেত্রে কি ধরণের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করব। এই সমস্যা বা অফিস টানাপোড়নের সবগুলোই যে আপনার কর্মক্ষেত্রে ঘটবে তা নয়।
(১) কর্মক্ষেত্রে হিংস্রতার শিকার হওয়াকর্মক্ষেত্রে হিংস্রতার শিকার হওয়া বলতে বোঝায় শারীরিক এবং মানসিকভাবে অপমানিত হওয়া, মৌখিক হুমকির মুখোমুখি হওয়া, সেক্সুয়ালি হ্যারাস হওয়া ইত্যাদি। সব ধরণের কর্মক্ষেত্রেই এরকম সমস্যা হতে পারে। এতে ভিক্টিম সাময়িক এমনকি দীর্ঘসময়ের জন্যও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যেতে পারে। তার কাজ, স্বাভাবিক জীবন, পরিবার এতে চরমভাবে অসুবিধার সম্মুখীন হয়। মনে রাখতে হবে, এটি একটি গুরুতর সমস্যা।
(২) বৈষম্যের শিকারকর্মক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি প্রায়ই দেখা যায়। বয়স, চেহারা, লিঙ্গ, জায়গা, ধর্ম, রাজনীতি, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, পদ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে এক বা একাধিক ব্যাক্তির সাথে যে আচরণ বা ব্যবহার করা হয় তা নীতিবহির্ভূত একটি কাজ। কোন কর্মীকে শুধুমাত্র তার যোগ্যতা এবং কাজ দ্বারা মূল্যায়ন করতে হবে। এর কারণে চাকরী চলে যাওয়া, কাজে নানা ধরণের বিরক্ত করা, অন্য কর্মীদের থেকে ভিন্ন নজরে দেখার মতো সব ব্যাপারগুলো হতে পারে।
(৩) ডমিনেশন এবং বুলিং এর শিকার হওয়াকর্মক্ষেত্রে বুলিং এর মানে হচ্ছে; অন্যের হাসি তামাশার খোরাক হওয়া, অপমানিত হওয়া, গুজব ছড়া, চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি, অতিরিক্ত কাজের ভার দেয়া ইত্যাদি।
(৪) কর্মক্ষেত্রে অনিরাপত্তাকর্মক্ষেত্রে নানা ধরণের অনিরাপত্তাজনিত সমস্যা থাকতে পারে। যেমন, শারীরিক অনিরাপত্তা, প্রয়োজনে যাতায়াত সুবিধা না থাকা, অযথা দেরি করানো, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র, সঠিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি অসুবিধা কাজে অনাগ্রহ ও অমনোযোগিতা বাড়ায়।
(৫) কর্মক্ষেত্রে রাজনীতিবলা হয়, সম্পূর্ণ দেশেও এতটা রাজনীতি হয় না যতটা অফিসে হয়ে থাকে! এই রাজনীতি ব্যাক্তিগত নেটওয়ার্ক এবং ক্ষমতার বলে সংগঠিত হয়।এক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রের লাভ এর চেয়ে ব্যাক্তিগত লাভটাই বেশি নজরে পড়ে।
[picture]
এইতো গেল কিছু অসুবিধার কথা। এখন এই সমস্যাগুলো থেকে নিজেকে বের করে আনার কিছু উপায় বলব।
(১) প্রতিটি সমস্যারই কিছু সমাধান রয়েছেপৃথিবীতে এমন সমস্যা খুব কমই রয়েছে যার কোন সমাধান নেই। অনেক সময় সমস্যাটির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ সমস্যাটির ধরণই বদলে দেবে এবং স্থায়ী কোন সমাধান নিয়ে আসবে।মাথা ঠান্ডা রেখে ধৈর্যের সাথে সবকিছুই ম্যানেজ করা সম্ভব।
(২) অতিরিক্ত কাজ থেকে বিরতি নেয়ামনে রাখতে হবে, কাজ আর টাকাই সবকিছু নয়। অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব অনেক সময়ই নিজের ব্যাক্তিগত কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। যতটুকু কাজ করলে নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য সময় বের করা সম্ভব ততটুকুই করা উচিত। প্রয়োজনে বস এর সাথে কথা বলে ব্যাপারটা ঠিক করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, অনেক কাজ এলোমেলোভাবে করার চেয়ে অল্প কাজ সুন্দরভাবে শেষ করা ভালো।
(৩) শান্ত ও ধৈর্যশীল হওয়ামনে রাখতে হবে পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী নয়, আমাদের সমস্যাগুলোও নয়। তাই অস্থির না হয়ে সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। অনেক সময়ই বস বদলি হয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারে, আপনার প্রোমোশন হতে পারে, আরও ভালো কোন সুযোগ আসতে পারে, আপনার মানসিক ক্ষমতা এবং ধৈর্যশক্তি বৃদ্ধি পেতে পারে।
(৪) বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুনআপনার বস অথবা উপরস্থ কাউকে আপনার সমস্যার কথা গুছিয়ে বলার চেষ্টা করুন। অথবা যার সাথে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার সাথে খোলাখুলি আলোচনা করুন। আড়ালে উল্টোপালটা কথা বলে বেড়াবেন না, এতে সমস্যা এবং মানসিক চাপ আরও বাড়বে।
(৫) নিজের ভুল শিকার করুন এবং নিরহংকারী হবার চেষ্টা করুনকোন ভুল করলে তা যত দ্রুত সম্ভব শিকার করুন এবং তার ক্ষতিপূরণ দেবার জন্য প্রস্তুত থাকুন। কর্মক্ষেত্রে কখনও নিজের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং সম্পদের জোর বা অহংকার দেখানোর চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন, আত্মসম্মানবোধ আর অহংকার দুটো দুই জিনিস। দুটো গুলিয়ে ফেললে ক্ষতি আপনারই।
(৬) কারো প্রশংসার আশা না করে নিজেই নিজের সমালোচক হউন'কেউ আমার কাজের প্রশংসা করে না'- এই বাক্যটি উচ্চারিত হয়নি এমন অভিমানী মানুষ খুব কমই আছেন। কেও প্রশংসা করুক বা না করুক, আপনি নিজের কাজ নিজের অনুপ্রেরণায় করে যাবেন। সমালোচনার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার, ওসবে কান না দিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এবার আমার লেখনির মূল জায়গায় যাব। কর্মক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস না থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা দুষ্কর। কীভাবে কর্মক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো যায় তা নিয়েই এখন জানব।
(১) পরিস্থিতিকে নতুনভাবে গঠন করাযেকোনো ধরণের পরিস্থিতির জন্য সবসময় ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে। কোন প্রেজেন্টেশন, মিটিং, বিভিন্ন রকম লোকজনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, তাদের কনভিন্স করা এসব ক্ষেত্রে নার্ভাস হওয়াটা খুব স্বাভাবিক কিন্তু মনে রাখতে হবে যে নিজের নার্ভাসনেস কাটিয়ে সুন্দর এবং গঠনমূলকভাবে কাজটাকে পরিণতি দিতে পারে সেই সফল। তাই সব দ্বিধা, ভয় এবং অস্বস্তি দূরে সরিয়ে দিয়ে কাজটির মুখোমুখি হতে হবে এবং তা শেষ করতে হবে।
(২) প্রস্তুতি গ্রহণযেকোন কাজ করার আগে তার জন্য কিছু প্রস্তুতি নিন। চেষ্টা করুন কাজটি হাতে কলমে বারবার করে তা থেকে অভিজ্ঞতা নিতে অথবা কাজটি সম্পর্কে কিছু পড়াশোনা করতে। যেমন ধরা যাক, খুব জরুরী কোন প্রেজেন্টেশন দিতে হবে তার আগে অবশ্যই যে ব্যাপারগুলো খেয়াল রাখতে হবে তা হল:
- আপনি যা বলতে চান তা কাগজে লিখুন এবং বারবার প্র্যাকটিস করুন।
- প্রেজেন্টেশনে আপনার ব্যাক্তিত্ত সঠিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে কি না তা খেয়াল রাখুন।
- সম্পূর্ণ টপিক সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা রাখুন এবং তা সুন্দরভাবে মুখস্ত করে নিন।
- নিজের বন্ধু অথবা কলিগদের সামনে প্র্যাকটিস করতে পারেন যাতে প্রেজেন্টেশন এর দিন কোন সমস্যার মুখোমুখি না হতে হয়।
নতুন ধরণের কোন কাজ দেখে ভয় পেয়ে কোন বাহানা দিবেন না, চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিন। বারবার প্র্যাকটিস করুন, ধারণা নিন। আপনি অবশ্যই সফল হবেন। There's a saying that, 'Practice makes a man perfect'. কথাটি সবসময় মনে রাখার চেষ্টা করুন।
(৪) বডি ল্যাঙ্গুয়েজবডি ল্যাঙ্গুয়েজ কর্মক্ষেত্রে বেশ বড় একটি ব্যাপার। এটি নির্ধারণ করবে আপনি অন্যদের দৃষ্টিতে কেমন। আপনি যখন দাড়িয়ে কারো সাথে কথা বলছেন তখন সোজা হয়ে দাঁড়াবেন, চেয়ারে বসে থাকাকালীনও ঘাড় এবং মেরুদন্ড সোজা রেখে বসবেন। সঠিক উপায়ে দাঁড়ানো বা বসা আপনার আত্মবিশ্বাস কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিবে। তার সাথে কারো সঙ্গে কথা বলাকালীন চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন,অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলা বেয়াদবি, ভয় এবং অস্বস্তির প্রকাশ ঘটায়।
(৫) অনুপ্রেরণা নেয়ালক্ষ করুণ, সফল ব্যাক্তিরা তাঁদের কর্মক্ষেত্রে কতটা সুন্দরভাবে কথা বলে, মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে, নিয়ম মেনে চলে ইত্যাদি। অনুকরণ নয়, অনুপ্রেরণা নিন এবং এগিয়ে যান।
(৬) সঠিক পোশাক এবং স্টাইল নির্বাচনআপনার পোশাক আপনার নিজের প্রতি আস্থা বাড়িয়ে দিবে। অফিসে পরিচ্ছন্ন এবং মার্জিত পোশাক পরুন। ছেলে-মেয়ে উভয়ই অতিরিক্ত রঙিন এবং চকচকে পোশাক পরা থেকে বিরত থাকুন। এমন কোন স্টাইল নির্বাচন করবেন না যা অফিসে আপনাকে হাসির পাত্রে পরিণত করে অথবা যা আপনাকে মানায় না। ঝকঝকে এবং শব্দবিহীন জুতো পরুন যা আপনার পোশাকের সাথে মানানসই।
(৭) একটি কাগজে নিজের অতীতের কিছু সফলতার কথা লিখুনকখনো হতাশ হয়ে পড়বেন না, নিজে যেসব ব্যাপারে আগ্রহী, যা আপনার ভালো লাগে এবং যেসব ব্যাপারে আপনি সাফল্য অর্জন করেছেন তা নিয়ে লিখুন। মাঝে মাঝে পড়ুন, সম্ভব হলে অফিস রুমে বা কেবিনেটে টুকরো কাগজে তা লিখে টাঙিয়ে রাখুন। প্রতিদিন এসব চোখের সামনে থাকলে নিজের প্রতি বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে।
(৮) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুনখুব ছোটখাটো ব্যাপারেও মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শিখুন। অফিসের স্টাফ থেকে শুরু থেকে উপরস্থ, অধিনস্থ সবার প্রতিই ভালো ব্যবহার এবং আন্তরিকতা প্রকাশ করুন।
(৯) সমালোচনা মেনে নেয়ার চেষ্টা করুননিজের সমালোচনা মেনে নিয়ে তা শুধরে ফেলার চেষ্টা করুন। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তা হাসিমুখে এড়িয়ে চলুন।
(১০) নিজেকে সময় দিনপর্যাপ্ত বিশ্রাম পরবর্তীতে নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রধান উপাদান। নিজের এবং নিজের শখ, পরিবারের জন্য সময় বের করুন। তাদের ভালোবাসা এবং অনুপ্রেরণা কর্মক্ষেত্রে আপনাকে অনেকটাই উচ্ছসিত এবং ক্লান্তিহীন রাখবে।
জীবনে চলতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হয়নি এমন একটা মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সমস্যা, ব্যর্থতা, ঝুঁকি, বিরক্তি, ক্লান্তি নিয়েই আমাদের পথ চলতে হয়। জীবনে যারা সফল হয়েছেন তারাও এসবের বাইরে ছিলেন না। তবু তারা সকল বাঁধাকে অতিক্রম করে, সব সমস্যা ঝেড়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসকে কৌশল করেই সাফল্য অর্জন করেছেন। কর্মক্ষেত্রে নানান অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করাটা কিছুটা কঠিন হলেও অসম্ভব কখনোই না।উপরোক্ত কৌশল এবং ইচ্ছেশক্তিকে কাজে লাগিয়ে কর্মজীবনে সফল হওয়া সম্ভব।
লিখেছেন - মোহছেনা দেওয়ান পৃথিল






